এদিকে হরমুজ প্রণালিও বন্ধ রয়েছে। এ প্রণালি হয়ে এলএনজি পরিবহন এক মাস বন্ধ থাকলে এশিয়ার স্পট মার্কেট এলএনজির দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম ২৫ ডলারে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং এবং আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস।
যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতার। সারা বিশ্বে চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে দেশটি, যার সবটাই রফতানি হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে।
বাংলাদেশেও এলএনজির বড় সরবরাহকারী দেশ কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ যদি কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম বন্ধ থাকে, তাহলে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে গেলে আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) হিস্যা দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার বড় সরবরাহকারী কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কাতার এনার্জি। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি হয় তার ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে এ সংস্থা। দীর্ঘমেয়াদে কাতার এনার্জির এলএনজি উৎপাদনসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তা দেশের গ্যাস খাত থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।
কাতার এনার্জির এলএনজি কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পর গতকাল তাৎক্ষণিকভাবে ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দিনের শুরুতে ডাচ টিটিএফ ন্যাচারাল গ্যাস ফিউচারের দাম প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা ছিল ৩৯ ইউরো। একপর্যায়ে এটি প্রায় ৪৯ ইউরোতে উঠে যায়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এটি সর্বশেষ ৪৩ ইউরোতে লেনদেন হয়েছে।
দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গত সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে কাতারের এলএনজি বড় ভূমিকা রাখছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে কাতারের এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। এই এলএনজি বর্তমানে দেশের শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘কাতারের এলএনজি উৎপাদনসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকাটা দীর্ঘমেয়াদি হলে তা দেশের গ্যাস খাতকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তা কমে গেলে বিদ্যুতে লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
অবশ্য জ্বালানি বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে দেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। সেখানে বলা হয়, চলতি মার্চের জন্য মোট ১১টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে নয়টি কার্গো সংঘাতপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করেছে।
কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদে জিটুজি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কাতার এনার্জি এবং ওমানের ওকিউটি ট্রেডিং থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়।
কাতারের সঙ্গে জিটুজি চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ৪০ কার্গো করে এলএনজি আমদানি করে পেট্রোবাংলা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বার্ষিক আমদানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কাতার থেকে ২৪ কার্গো এলএনজি এসেছে দেশে। বাকি কার্গোও ধারাবাহিকভাবে আমদানি হওয়ার কথা রয়েছে।
জিটুজি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের ১৫ বছর মেয়াদে এলএনজি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কাতারের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল প্রথম এলএনজি কার্গো আসে দেশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাতার থেকে মোট ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানি করে পেট্রোবাংলা, পরিমাণের হিসাবে যা ছিল মোট আমদানির ৪২ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সমপরিমাণ কার্গো এলএনজি দেশে আসার কথা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরে কাতার থেকে আটটি এলএনজি কার্গো এসেছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জানুয়ারি পর্যন্ত ২৪ কার্গো এলএনজি এসেছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে আরপিজিসিএলের ওয়েবসাইটে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতি যে শুধু বাংলাদেশের জন্য এমনটি নয়। আমদানিকারক সব দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমরা জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। যাতে ঘাটতি তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস খোঁজারও উদ্যোগ রয়েছে।’
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই এলএনজি আমদানি করতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে অবস্থিত কাতার এনার্জির একটি জ্বালানি স্থাপনা এবং মেসাইদে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গতকাল ড্রোন হামলা হয়েছে। রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রফতানি কেন্দ্র। সেখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম বন্দর, গ্যাস-টু-লিকুইড, পেট্রোকেমিক্যাল, রিফাইনারি এবং বিদ্যুৎ ও পানি লবণমুক্তকরণ প্লান্টসহ বিস্তৃত অবকাঠামো। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেনজি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে এলএনজি পরিবহন ব্যাহত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সীমিত কার্গো নিয়ে প্রতিযোগিতা আবারো তীব্র হয়ে উঠতে পারে। এখন কাতারের এলএনজি উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে।